Friday, September 27, 2013

একুশ শতকে উন্নয়নের জোয়ার এবং আমাদের প্রস্তুতি

hmet2004@yahoo.com

আমরা মনে করি, ৯টি মহাকারণে একবিংশ শতাব্দী ও তারপর মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর বিশেষভাবে বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বর্ণযুগ হতে যাচ্ছে তা হলোÑ (১) মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বিশ্বের গড় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের তুলনায় বেশি। (২) তরুণ মুসলিম জনসংখ্যা বিশ্বব্যাপী গড় তরুণ জনসংখ্যার তুলনায় বেশি। (৩) তেলের ক্রমবর্ধমান মূল্যের কারণে মুসলিম দেশগুলোই বিশেষ সুবিধা লাভ করবে। (৪) সস্তা শ্রম ও মজুরি পার্থক্যের কারণে বেশির ভাগ বিনিয়োগ চলে যাবে মুসলিম দেশগুলোতে। (৫) ইতিহাসের অনিবার্য ধারাবাহিকতায় ইসলামিক আর্থসামাজিক মূল্যবোধের পুনরুত্থান। (৬) পারিবারিক সম্পদ ও ওয়াকফ সম্পত্তির উদ্ভব। (৭) মুসলিম জনসংখ্যা পুনঃস্থাপনের হার বিশ্বের সমগ্র জনসংখ্যা পুনঃস্থাপনের তুলনায় দ্রুত। (৮) পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক মন্দা এবং পেট্রো ডলারের অনিবার্য পতন। (৯) পশ্চিমা বিশ্বে পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও পাশ্চাত্যসভ্যতার অনিবার্য পতন।


 মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বিশ্বের গড় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের তুলনায় বেশি :
বিশ্বকোষের তথ্যানুসারে আগামী ২০১৬ সালে বিশ্বে মুসলমানদের সংখ্যা হবে ২০৩ কোটি ৪০ লাখ, যা হবে ধর্মাবলম্বী হিসেবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সম্প্রদায়। ইসলামের আবির্ভাবের হিজরি ১৪৩৪ বছরের ইতিহাসে এ রকম ঘটনা এই প্রথম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পিউ রিসার্চ সেন্টার ফোরাম অন রিলিজিয়ন অ্যান্ড পাবলিক লাইফের তথ্যানুসারে আগামী ২০ বছরের মধ্যে বিশ্বের মুসলিম জনসংখ্যা ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে, যা ২০১০ সালের ১.৬ বিলিয়ন থেকে ২০৩০ সাল নাগাদ বৃদ্ধি পেয়ে হবে ২.২ বিলিয়ন। আগামী দুই দশকে বিশ্বব্যাপী মুসিলম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অমুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হবে। 

মুসিলম জনসংখ্যা গড় বৃদ্ধির হার যেখানে ১.৫ শতাংশ সেখানে অমুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ০.৭ শতাংশ। যদি বৃদ্ধির এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে তাহলে ২০৩০ সাল নাগাদ সমগ্র বিশ্বের জনসংখ্যা যে ৮.৩ বিলিয়ন হবে বলে অনুমান করা যাচ্ছে মুসলিম জনসংখ্যা হবে তার ২৬.৪ শতাংশ, যা ২০১০ সালে ছিল মোট ৬.৯ বিলিয়ন জনসংখ্যার ২৩.৪ শতাংশ। এই বিশ্লেষণ মূলত আগের জনসংখ্যাতাত্ত্বিক প্রবণতা এবং অনুমিতির ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। আর এই বিষয়টিই আগামী বছরগুলোতে মুসলিম দেশগুলোর আর্থসামাজিক উন্নয়নে এক বিশেষ ভূমিকা রাখবে।

 তরুণ মুসলিম জনসংখ্যা বিশ্বব্যাপী গড় তরুণ জনসংখ্যার তুলনায় বেশি:
 আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আগামী সহস্রাব্দে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। পশ্চিমা জনসংখ্যায় বয়োজ্যেষ্ঠ জনসংখ্যা বেশি (তরুণ জনসংখ্যা বয়োজ্যেষ্ঠের তুলনায় কম); কিন্তু মুসলিম জনসংখ্যা ঠিক তার উল্টো। আর সে জন্যই বিশ্বব্যাপী মুসলিম জনসংখ্যার বেশির ভাগই তরুণ আর এটাকেই বলা হচ্ছে ‘তারুণ্যস্ফীতি’। ২০০০ সালে মুসলিম কিশোর এবং ২০-২৯ বছর বয়সী তরুণের আনুপাতিক হার সর্বোচ্চে পৌঁছে এবং পুরো একবিংশ শতাব্দীজুড়ে এ অবস্থা চলতে থাকবে।

 মুসলমান-অধ্যুষিত দেশগুলোতে মাঝবয়সী জনসংখ্যা ১৯৯০ সালে ছিল শতকরা ১৯ ভাগ, তা ২০১০ সালে হয় ২৪ এবং ২০৩০ সালে তা ৩০-এ পৌঁছাবে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু তার পরও মুসিলম রাষ্ট্রগুলোর মাঝবয়সী জনসংখ্যা উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ এবং অন্য উন্নত রাষ্ট্রের তুলনায় কমÑ যেখানে ১৯৯০ সালে ছিল ৩৪, তা ২০১০ সালে বেড়ে হয়েছে ৪০ এবং ২০৩০ সালে তা হবে ৪৪। এই সময়ের মধ্যে বিশ্বের ১৫-২৯ বছর বয়সী মুসলিম তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্কদের সংখ্যা হবে প্রতি ১০ জনে তিনজন, যা সমগ্র জনসংখ্যার ২৯.১ শতাংশ। এভাবে মুসলিম তরুণ জনসংখ্যা প্রতিস্থাপিত এবং তা স্থায়ীকরণের মাধ্যমে আগামী সহস্রাব্দের মধ্যে মুসলিম জনসংখ্যা হারানুপাতে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাবে এবং মুসলিম দেশগুলোর সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে বোঝা যায়। এতে একবিংশ শতাব্দীতে এবং তার পরেও মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে জীবনমানের প্রগাঢ় উন্নয়ন অব্যাহত থাকবে। 

তেলের ক্রমবর্ধমান মূল্যের কারণে মুসলিম দেশগুলোই বিশেষ সুবিধা লাভ করবে:
 চীন ও ভারতের অর্থনীতির ক্রমপ্রসার খনিজ তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে, আর এতে অনেক মুসিলম রাষ্ট্র লাভবান হতে পারে। ২০১২ সালেই চীন জাপানকে হটিয়ে দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, আর জাপান এখন তিন নম্বরে। জাপান প্রায় ৪৬ বছর ধরে দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে তার অবস্থান ধরে রেখেছিল। ২০০৮ সালের পর থেকে চীন তার বৈদেশিক বাণিজ্যের ৫০ শতাংশ এশিয়ায় সম্প্রসারিত করতে পেরেছে, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পেরেছে ১৫ শতাংশ। এশিয়ায় চীনের বৈদেশিক বাণিজ্য বাজার ৯০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আমেরিকায় বাণিজ্যের তিন গুণ। ২০০২ সালে চীন আমেরিকা থেকে যে পণ্য আমদানি করেছে, এশিয়া থেকে তার ৫ গুণ বেশি পণ্য আমদানি করেছে। আর এখন আমেরিকার তুলনায় এশিয়া থেকে ১০ গুণ পণ্য আমদানি করে। বাণিজ্যের এই প্যাটার্ন অনুসারে দেখা যায়, আমেরিকান ডলারের তুলনায় এশিয়ার মুদ্রা এবং চীনের রেনমিনবি কাছাকাছি বাণিজ্য করছে। অধিকন্তু ভারতীয় অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান প্রসার শুধু তেলের দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে তাই নয়, বরং শ্রমের মজুরিও বাড়িয়ে দিচ্ছে। 

সস্তা শ্রম ও মজুরি-পার্থক্যের কারণে বেশির ভাগ বিনিয়োগ চলে যাবে মুসলিম দেশগুলোতে:
 আগেই কিছুটা ধারণা দেয়া হয়েছিল যে শিল্পের বিকাশ ক্রমান্বয়ে মুসলিম দেশগুলোতে ছড়িয়ে যাবে, কারণ চীন, ভারত ও অন্যান্য অমুসলিম রাষ্ট্রে শ্রমের মজুরি বৃদ্ধি একটি ক্রমবর্ধমান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই মজুরি পার্থক্য মুসলিম দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নকে আরো ত্বরান্বিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। চীন, ভারত ও অন্যান্য অমুসলিম দেশের কায়িক শ্রমনির্ভর কলকারখানা যেমনÑ গার্মেন্ট শিল্প প্রতিযোগিতামূলক বাজার থেকে পিছিয়ে পড়ছে। ইতোমধ্যে তুলনামূলক সস্তা শ্রমের সুফল গ্রহণ করার জন্য বেশ কয়েকটি আমেরিকান কোম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছে। আগেই বলা হয়েছে, আগামী দুই দশকের মধ্যেই মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অমুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় দ্বিগুণ হবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বার্ষিক জন্মহার মুসলিম দেশে যেখানে ১.৫ শতাংশ সেখানে অমুসলিম দেশে ০.৭ শতাংশ। এ কারণে সমগ্র বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের অপেক্ষাকৃত তরুণ এবং সস্তা শ্রম অচিরেই মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রভূত প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হবে। 

ইতিহাসের অনিবার্য ধারাবাহিকতায় ইসলামিক আর্থসামাজিক মূল্যবোধের পুনরুত্থান:
মুসলিম রাষ্ট্রগুলো ইসলামিক আর্থসামাজিক মূল্যবোধের হারানো গৌরব ফিরে পেতে যাচ্ছে। আর ইসলামের গৌরবোজ্জ্বল অতীত এবং ইতিহাস আমাদের সেই একই বার্তা দেয়। ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম ও অমুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে ১৯৭০ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বেশ কিছু ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা এ ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি। আর তা এটাই সগৌরবে ঘোষণা করছে যে অর্থনৈতিক ভারসাম্যের কাঁটা স্পষ্টই মুসলিম বিশ্বের দিকে হেলে রয়েছে। বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, সামগ্রিকভাবে সব ইসলামি ব্যাংক এবং বিশেষভাবে ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক শুধু প্রতিষ্ঠা হয়েছে তা-ই নয়, ইতোমধ্যে তাদের কার্যক্রমও সুসংহত ও স্থিতিশীল করেছে। 

বাংলাদেশের অন্তত আটটি পূর্ণমাত্রার ইসলামি ব্যাংক এবং অন্যান্য প্রচলিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যাংকের ইসলামি উইন্ডো বা ইউনিট পুরোদমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যাদের সমগ্র দেশে অন্তত ৫০০ শাখা রয়েছে, যা দেশের বেসরকারি ব্যাংকের মোট শাখার ২৫ শতাংশ। কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে ইসলামি ব্যাংকগুলো বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে ৩৪ শতাংশ জায়গা দখল করে আছে, আর সব ব্যাংকের মধ্যে তা ১৪ শতাংশ। এমনকি বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহত্তম এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাংক যথাক্রমে সোনালী ও অগ্রণী ব্যাংক ইতোমধ্যে তাদের প্রথাগত ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করেছে। তা ছাড়াও দু’টি আন্তর্জাতিক ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড এবং এইচএসবিসি ব্যাংকের ইসলামি উইন্ডো চালু রয়েছে। এতে এটাই প্রমাণিত হয় যে বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকের কার্যক্রম ইসলামি ব্যাংকিং সার্ভিস প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় যুতসই, দক্ষ ও আধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ জনবল ও কাঠামো তৈরি করতে সমর্থ হয়েছে।

 মুসলিম পারিবারিক সম্পদ এবং ওয়াকফ সম্পত্তির উদ্ভব:
এ রকমটি অনুমান করা হয় যে সারা বিশ্বের ৮০০ বিলিয়ন ডলারের অধিক মুসলিম পারিবারিক সম্পদ রয়েছে। এর ফলে ওই পরিমাণ সম্পদ মুসলিম রাষ্ট্রে বিনিয়োগের অন্যতম সুযোগও তৈরি হয়েছে। শরিয়া অনুসারে বিশ্বমানের সম্পদ ব্যবস্থাপনা সার্ভিসের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বোস্টন কনসালটিং গ্রুপের জরিপ অনুসারে এই বিশেষ ব্যক্তিবর্গ বা পরিবারগুলো তাদের সম্পদ পুঞ্জীভূত করছে, যার পরিমাণ অবিশ্বাস্য ১০.২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার! বেশ কিছু বেসরকারি ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে পেয়েছে যে গ্রাহকদের কাছে শরিয়া অনুবর্তী সেবা এবং সামগ্রীর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। 

আর একটা বিষয় যোগ করা যায় যে ওয়াকফ, এনডাউমেন্ট এবং ক্যাশ ওয়াকফে বিনিয়োগ করার বিশেষ সুযোগ রয়েছে। এটা উল্লেখ করা যায়, অনেক মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশে শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের হাতে টাকা রয়েছে তা-ই নয়, বরং অর্থ সেখানে এনডাউমেন্ট আকারেও রয়েছে আর এ রকম এনডাউমেন্ট শুধু মুসলিম সমাজেই করা সম্ভব। যদিও বিশ্বব্যাপী ওয়াকফ সম্পত্তি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায় রয়েছে; কিন্তু এটাও সত্য যে একই অর্থকে তরলীকরণ করার বা ওয়াকফ সম্পত্তি বা সেবার উন্নয়ন বা সেই অর্থে সামাজিক উন্নয়নের কোনো নিয়মানুগ প্রচেষ্টা করা হয়নি। বাংলাদেশে প্রায় ৯৫ হাজার ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে; বাজার থেকে ফান্ড উত্তোলন করে সেগুলোর বাণিজ্যিক উন্নয়ন সম্ভব। আমাদের এই ওয়াকফ সম্পদের উন্নয়ন এবং বিলিয়ন ডলারের ক্যাশ ওয়াকফ ফান্ডের যথার্থ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন। 

মুসলিম জনসংখ্যা পুনঃস্থাপনের হার বিশ্বের সমগ্র জনসংখ্যা পুনঃস্থাপনের তুলনায় দ্রুত: বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক ২০০৮ সালের রিপোর্টে দেখা গেছে, সমগ্র বিশ্বে ২০০৫ সালে সক্ষম মহিলাপ্রতি গড় জন্মহার ছিল ২.৬। কিন্তু ৯টি মুসলিম দেশে এই হার ২.৮৫ বলে ধারণা করা যায়। ২০০৬ সালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, মানবজাতির প্রতিস্থাপনের জন্য প্রত্যেক মহিলার বিপরীতে ২.৩ জন সন্তান থাকতে হবে। তাই বিশ্বের গড় যেখানে .৩ সেখানে মুসলিম দেশগুলোতে তা .৭, যা দ্বিগুণেরও বেশি। ধর্মীয় অনুশাসন এবং পারিবারিক মূল্যবোধের কারণে এইডস মুসলিম দেশগুলোতে মহামারী আকার ধারণ করতে পারেনি। বিশ্বব্যাপী অমুসলিমের তুলনায় মুসলমানদের বৃদ্ধি দ্রুততর হওয়ার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। বিশ্বের গড় হিসাবে মুসলিম দেশগুলোর স্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো। তা ছাড়া নবজাত এবং শিশুমৃত্যুর হারও বিশ্বের গড় অবস্থানের তুলনায় কম এবং মানুষের গড় আয়ু অন্যান্য স্বল্পোন্নত দেশগুলোর তুলনায় মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতে দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 আমেরিকার অর্থনৈতিক মন্দা এবং পেট্রো ডলারের অনিবার্য পতন:
অস্থিতিশীল পাবলিক ঋণ (১৬ ট্রিলিয়ন অফিসিয়াল ঋণ এবং ৭০ ট্রিলিয়ন অফিসিয়াল দায়বদ্ধতা) পরিচালনায় ব্যর্থতা আমেরিকার বুনিয়াদি আর্থসামাজিক কাঠামোর জন্য হুমকি হতে যাচ্ছে। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বেশ বোঝা যায় আমেরিকার বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা অনেকটা সে রকম পরিস্থিতির মুখোমুখি যে কারণে রোমান, অটোম্যান ও সোভিয়েত সাম্রাজ্যের পতন হয়েছিল। বর্তমানে মূলত বাজেটের ঘাটতি মেটাতে অসামর্থ্যতার কারণেই আমেরিকার এই ‘রাজস্ব খাদ’ (Fiscal Cliff)। বাজেটের এই ঘাটতি মেটানো সম্ভব নয়, কারণ আমেরিকার মধ্যম শ্রেণীর চাকরি, জিডিপি এবং ট্যাক্স বেজ পরস্পরের অনুষঙ্গ, যা মূল স্রোতধারা থেকে দূরে সরে গেছে, আর এভাবেই ফেডারেল রাজস্ব হ্রাস পাচ্ছে। বর্তমানে আমেরিকান জনগণের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ৫০ হাজার মার্কিন ডলারেরও বেশি। এই অর্থনীতির বন্ধুর পথের শেষ নেই, কারণ গত ১১ বছর ধরে প্রায় অর্ধডজন মুসলিম রাষ্ট্রের ওপর হামলা আমেরিকাকে এ খাদের দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে। আর এ যুদ্ধ শুধু সামরিক বা নিরাপত্তা বিষয়ক কমপ্লেক্সকে লাভবান করেছে।

এই বাজেট ঘাটতি কোনোভাবেই মেটানো সম্ভব নয়। আমেরিকান অর্থনীতিতে শুধু ব্যাংককে রক্ষা করাই মুখ্য নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। আর সে কারণেই এই ভ্রান্ত আর্থিক অপ্রতিবিধান অর্থনৈতিক পতনকে রক্ষা করতে পারেনি। সে কারণে জনগণের ভর্তুকির অর্থ মেটাতে গিয়েই আমেরিকার অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং ব্যক্তিবিশেষের কাছে এমন তথ্যপ্রমাণ রয়েছে যা দেখে প্রতীয়মান হয় যে, আমেরিকান ডলার সোনা বা রুপায় রূপান্তর হচ্ছে এবং এমনকি তা অন্য মুদ্রায়ও রূপান্তরিত হচ্ছে। রাশিয়া, চায়না, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের নিজেদের মধ্যে ডলারের পরিবর্তে তাদের নিজেদের মুদ্রায় বাণিজ্য করতে আগ্রহী হয়ে পড়েছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ভুক্ত রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের মধ্যে বিনিময়ের জন্য ইউরোকে বেছে নিয়েছে। এশিয়ান রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজেদের মধ্যে বিনিময়ের জন্য একটা সাধারণ মুদ্রা চালুর ব্যাপারে একমত হতে আলোচনা করছে।

 আমেরিকায় এই সঙ্কট মূলত ডলারের আসন্ন দরপতনের অনিবার্য সম্ভাব্যতার কারণে। স্বর্ণ ও রৌপ্যের তুলনায় ইতোমধ্যে ডলার তার জৌলুশ হারিয়েছে। ২০০৩ সাল থেকে গত ১০ বছরে আমেরিকান ডলার প্রতি আউন্স সোনার বিপরীতে দর হারিয়েছে প্রায় ১৫০০ ডলার। ২০০৩ সালে ১ আউন্স সোনার দাম ছিল যেখানে ২৫০ ডলার বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ১৩৭৫ ডলার। রৌপ্যের ক্ষেত্রেও অনুরূপ। ২০০৩ সালে ১ আউন্স রৌপ্যের মূল্য ছিল ৪ ডলার, বর্তমানে ১ আউন্স রৌপ্যের মূল্য ৩৪ ডলার। এই মূল্যের উল্লম্ফন সোনা ও রুপার দু®প্রাপ্যতার কারণে হয়েছে তা কিন্তু নয়, বরং প্রিন্টিং প্রেস এই দু’টি প্রাচীন মুদ্রার যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেনি।

 পশ্চিমা বিশ্বে পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও পাশ্চাত্যসভ্যতার অনিবার্য পতন: পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর পারিবারিক মূল্যবোধের অধঃগতি একবিংশ শতাব্দীতে তাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ইউনাইটেড স্টেটস সেন্সাস ব্যুরো ওয়ার্ল্ড পপুলেশন অনুসারে ২০০৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর বিশ্বের জনসংখ্যা ছিল ৬.৭৮৪ বিলিয়ন। ২০০৮ সালে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ১.১ শতাংশ, কিন্তু কোনো সভ্যতাকে টিকে থাকতে হলে জন্মহার হওয়া উচিত অন্তত ১.৪ জন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রগতি এবং কৃষি ক্ষেত্রে সবুজের সমারোহ মৃত্যুহার রোধে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। 

পাশাপাশি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ, লিভ টুগেদার সংস্কৃতি, পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং বিবাহিত দম্পতিদের সন্তান গ্রহণে অনীহা পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোতে জন্মহার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, ইউরোপের দেশগুলোতে খ্রিষ্টান সম্প্রদায় সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ক্রমে উদ্বেগজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে। খ্রিষ্টান-অধ্যুষিত দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণ এইডসের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম করছে, পক্ষান্তরে মুসলমান-অধ্যুষিত এলাকা যেমন মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এবং উত্তর আফ্রিকার কিয়দংশ ইসলাম ধর্মের মূল্যবোধ এবং পারিবারিক কাঠামোকে ধারণ করে ভালোভাবেই টিকে আছে। সেখানকার প্রাপ্তবয়স্করা বিয়ে করতে পছন্দ করে এবং বিয়ের পর সন্তান নিতেও সমান আগ্রহী। খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মতো তারাও আধুনিক চিকিৎসার সংস্পর্শে থাকে। ফলাফলস্বরূপ, খ্রিষ্টান অধ্যুষিত পশ্চিমা রাষ্ট্র এবং মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্রগুলোতে মৃত্যুর হার সমান হলেও জন্মহার মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে বেশি হওয়ায় মুসলিম জনসংখ্যা অনিবার্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এ মুহূর্তে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ২.৪ শতাংশ আর এটা সম্ভব হয়েছে মূলত ধর্মীয় মূল্যবোধের কারণেই মুসলিম দেশগুলো মহামারী এইডসকে এড়াতে সক্ষম হওয়ায়। এর থেকে সহজেই বুঝতে পারি পাশ্চাত্যসভ্যতার অনিবার্য পতনের ধারা শুরু হয়েছে। এই ঘটনাকে সভ্যতার সঙ্ঘাত বলা যায় না। একবিংশ শতাব্দীতে ইসলাম ও পাশ্চাত্যসভ্যতার সঙ্ঘাতের কথা স্যামুয়েল হান্টিংটন তার এক আলোড়নকারী লেখায় বলেছিলেন যা ১৯৯৩ সালে আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রিপোর্টে প্রকাশ হয়। তার এই ভবিষ্যদ্বাণী সঠিক নয় বলে আমরা মনে করি। কারণ পাশ্চাত্য সভ্যতার অনিবার্য পতনের জন্য অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষই দায়ী। ধর্মনিরপেক্ষতা, জাগতিক মূল্যবোধের ওপর জোর এবং পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে পাশ্চাত্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার স্থির হয়ে আছে, তা আজ মাত্র ১.১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা একটি সভ্যতার মৃত্যুর সঙ্কেত বহন করে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় পাশ্চাত্য সভ্যতার পতন ঘটবে যেমনভাবে অতীতে অনেক সভ্যতা বিলীন হয়ে গেছে। এই শতাব্দীর মধ্যেই এ ঘটনা ঘটলে আমরা বিস্মিত হবো না।

(সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদÑ ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) জেদ্দা প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড )