৯ই জুলাই,২০১৩ সালে মিশরের মুরসী সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে Tariq Ramadan রচনা করেন Egypt: Coup d’État, Act II।
লেখাটির গুরত্ব বিবেচনায় রেখে বাংলা ভাষাভাষি ইসলামি জ্ঞান
অনুসন্ধিৎসুদের চাহিদা মেটাতে এর অনুবাদ প্রকাশ করা হলো। আর এর বাংলা
অনুবাদ করেছেন ‘ইসলাম ও বিশ্বব্যবস্থা’ বিষয়ক গবেষক আবু সুলাইমান ।
source of Bangla Translation
source of Bangla Translation
কেন আমি মিশর সফর করছিনা? গত দুই বছর
আমাকে অসংখ্যবার এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে। কারণ মোবারক সরকারের
আমলে বিগত ১৮ বছর আমার মিশর সফরের উপর নিষেধাজ্ঞা বহাল ছিল । ঠিক একই
উত্তর আমাকে অসংখ্যবার দিতে হয়েছে যে, সুইজারল্যান্ড ও ইউরোপীয় বিভিন্ন
কর্মকর্তাদের মাধ্যমে যতটুকু জানতে পেরেছিলাম সে মোতাবেক, মিশরের রাজনীতির
পুর্ণ নিয়ন্ত্রনে ছিল মিশরের সেনাবাহিনী এবং মুহুর্তের জন্য ও মিশরের
রাজনৈতিক অঙ্গন পরিত্যাগই করেনি।
মিশরের “বিপ্লবের ব্যাপারে কখনোই আমি অতিরিক্ত আগ্রহ প্রকাশ করিনি” অথবা “মিশরের বিপ্লব তিউনিশিয়ার চাইতে কোন অংশে বেশি” একথা বিশ্বাস করিনি । এই দুই দেশের জনগনই স্বৈরতন্ত্রের অধীনে আর্থনীতিক ও সামাজিক সমস্যায় জর্জরিত ছিল। দুই দেশের জনগন তাই বিদ্রোহ করেছিল আত্মমর্যাদা, সামাজিক সুবিচার ও স্বাধীনতার জন্য । তাদের এই জাগরণ, বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব ও সাহস তাই অভিনন্দনযোগ্য । কিন্ত সাধারণ জনগনকে বুঝানোর জন্য রাজনৈতিক, ভূ-কৌশলগত ও আর্থনীতিক প্রসঙ্গের সরলীকরন সম্পুর্নরুপে অযৌত্তিক। তিন বছর আগে প্রকাশিত একটি বই এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন সিরিজ আর্টিকেলের মাধ্যমে আমি আমার পাঠকদের কিছু জটিল সমস্যা এবং সেগুলোর ভূকৌশলগত ও আর্থনীতিক ভিত্তির ব্যাপারে সজাগ করার চেষ্টা করছিলাম। এই সমস্যা এবং তার মূল ভিত্তিগুলো সর্বদাই মূল ধারার রাজনীতি ও মিডিয়া-বিশ্লেষণ থেকে বাদ পড়ছিলো এবং সেখানে “আরব বসন্তের” ফলে উদ্ভুত জনগনের আবেগ-উচ্ছ্বাসকে সমালোচনামুলক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করার উপর জোর দেওয়া হয়েছিল।
‘মিশরের সামরিক বাহিনী রাজনীতিতে
প্রত্যাবর্তন করেনি’ বিষয়টি এমন নয়। আসলে সামরিক বাহিনী রাজনীতির অঙ্গন
পরিত্যাগই করেনি। মোবারক সরকারের পতন ছিল মূলত একটি সামরিক অভ্যুত্থান। এই
অভ্যুত্থান বেসামরিক সরকারের আড়ালে সামরিক বাহিনীর নতুন অফিসারদেরকে
রাজনীতির অঙ্গনে আগমনের সুযোগ করে দেয়। ২৯ শে জুন,২০১২ সালে প্রকাশিত একটি
আর্টিকেলে আমি একজন উচ্চ পদস্থ আর্মি অফিসারের বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছিলাম
যে, “প্রেসিডেন্টের নির্বাচন হচ্ছে ক্ষনস্থায়ী এবং এটা সবোর্চ্চ ৬ মাস
থেকে এক বছরের জন্য (লেখাটির শিরোনাম ছিল- An Election for Nothing)।” এই
পুরো প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করছিলো আমেরিকা প্রশাসন – গত ৫০ বছর ব্যাপী
যাদের মিত্র ছিলো মিশরের সেনাবাহিনী, মুসলিম ব্রাদারহুড নয়। জুলাই’র ৫
তারিখের “International Herald Tribune” এবং ৬ তারিখের “Le Monde” নিশ্চিত
করে যে, ৩০ শে জুনের অনেক আগেই প্রেসিডেন্ট মুরসীকে ক্ষমতাচ্যুত করার
পরিকল্পনা করা হয়। প্রেসিডেন্ট মুরসী এবং আর্মি জেনারেল আব্দুল ফাতাহ
আল-সিসির এক আলাপ হতে জানা যায় যে, সামরিক অভ্যূত্থান ও মুরসীকে বন্দী
করার পরিকল্পনা এই তথাকথিত জনপ্রিয় সরকার বিরোধী আন্দোলনের কয়েক সপ্তাহ
পূর্বেই করা হয়েছিল । “জনগনের ইচ্ছানুসারে” এই ক্ষমতাচ্যুতি বলে সামরিক
অভ্যূত্থানকে বৈধতা দেয়া হয়েছে । ‘চতুর কৌশলের’ মাধ্যমে আসলে জনগনকে
সরকার বিরোধী আন্দোলনে নামানো হয়েছে এবং দেখানো হয়েছে যে, আর্মি জনগনের
অধিকার ও দাবী দাওয়ার বিষয়ে সচেতন এবং সামরিক ক্যু হচ্ছে জনগনের অধিকার ও
দাবী দাওয়া পূরণের জন্য অত্যাবশ্যকীয়ভাবে গৃহীত দ্বিতীয় পদক্ষেপ ।
তাহলে মিশরের এই সামরিক অভ্যূত্থানে আমেরিকা প্রশাসনের তাৎক্ষনিক
প্রতিক্রিয়াকে কিভাবে বিশ্লেষন করা যায়? যেখানে “সামরিক অভ্যুত্থান”
শব্দটি সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে (যদি শব্দটি ব্যবহার করা হতো–তাহলে
মিশরের নতুন প্রশাসন আমেরিকার আর্থিক সাহায্য থেকে বঞ্চিত হতো)? সরকারের
এই অবস্থান কৌতুহলুদ্দীপক । এরা এমন শব্দ ব্যবহার করেছে যাতে
অভ্যূত্থানকারিদের রাজনীতিক, আর্থনীতিক ও আইনগত সকল সুবিধা দেয়া যায় । আর
ইউরোপীয় ইউনিয়ন অবশ্যই আমেরিকার নীতি ফলো করে বলবে: “আর্মি গনতান্ত্রিক
প্রক্রিয়ায় জনগনের ডাকে সাড়া দিয়েছে”।
এগুলো সব খোঁড়া যুক্তি। রহস্যজনকভাবে, মুরসীর পতনের পর লোডশেডিং, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের ঘাটতি চরম আকার ধারন করেছে। এটা এই কারনে যে, যাতে প্রমাণ করা যায়- জনগন এসব নিত্য-প্রয়োজনীয় মৌলিক উপায় উপাদান হতে মুরসীর শাসনামলে বঞ্চিত হচ্ছিল । এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্টে এটা ধরা পড়েছে যে, আর্মি প্রশাসন কিছু কিছু জায়গায় মুরসী বিরোধী আন্দোলনকারিদের কোন বাধা না দিয়ে বরং সহিংস কার্যকলাপে সহায়তা করে। মনে হয় যেন এটা কোন পূর্ব পরিকল্পনার অংশবিশেষ । সশস্ত্র বাহিনী হেলিকপ্টার থেকে তোলা এমন সব ছবি আন্তজার্তিক মিডিয়া গুলোকে সরবরাহ করেছে, যেখানে চিত্রিত হয়েছে জনগন তাদের উদ্যোগকে স্বাগত জানাচ্ছে (Le Monde’র মতে)।
আসলে কোন কিছুই পরিবর্তন হয়নি। আরব বসন্ত কিংবা মিশর বিপ্লব যাই বলিনা কেন, সব কিছুই চলছে জেনারেল আব্দুল ফাতাহ আল-সিসির নিয়ন্ত্রনে। আব্দুল ফাতাহ আল সিসি যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষন প্রাপ্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি প্রধানের সাথে তিনি ঘনিষ্ট যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন । জুলাই ৬-৭ তারিখের International Herald Tribune থেকে জানা যায় যে, জেনারেল সিসি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরাঈল সরকারের সাথে সমভাবে ঘনিষ্ঠ । বর্তমানে এবং মুরসীর শাসনামলে তিনি তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। আল সিসি পূর্বে উত্তর সিনাই-অঞ্চলে আর্মি গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্ব পালন করেন এবং তৎকালীন সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ও ইজরাঈলের সাথে মধ্যস্থতাকারির ভূমিকাও পালন করেন। একথা বলা তাই অযথার্থ হবেনা যে, যুক্তরাষ্ট্র কখনোই ইজরাঈলের ন্যয় মিশরের উন্নয়নে প্রকৃত ভূমিকা পালন করেনি।
এতসব ঘটনার পরেও মুরসী, তার মিত্র, এবং সংগঠন হিসাবে মুসলিম ব্রাদারহড অতি সরলীকরণ, অনভিজ্ঞ আচরণ এবং অন্যান্য যে ভুল করেছে তাতে আশ্চর্য না হয়ে পারা যায়না। গত তিন বছর জুড়ে আমি ‘লিবার্টি এন্ড জাষ্টিস’ পাটির এবং মুসলিম ব্রাদারহডের চিন্তা ও কর্ম-কৌশলের সমালোচনা করে যাচ্ছি । (গত ২৫ বছর ব্যাপী আমার সকল বিশ্লেষণ ও মন্তব্য ছিল মুসলিম ব্রাদারহুডের কর্মকৌশল ও পলিসির চরম সমালোচনামুলক) ।
তাদের সকল কৌশল/চাতুর্থ স্থূল । আমার সকল লেখা ( মার্চ. ২০১২ হতে ডিসেম্বর, ২০১২ পর্যন্ত লেখা সকল বই অথবা আর্টিকেল) ছিল মুরসীর এসব গুরুতর চিন্তা ও কৌশলের উপর কেন্দ্রীভূত । সরকারে সকল দলের অংশগ্রহন নিশ্চিত করার জন্য অথবা জাতীয় সংলাপে বসার আহ্বান জানানোর মাধ্যমে বিরোধীদের সাথে সর্ম্পক তৈরীর জন্য মুরসী যা করতে পারেনি তার পুরো দায়ভার মুরসীর উপর চাপানো ঠিক হবে না । কারণ তাদের সকল প্রচেষ্টাকে বিরোধীদের পক্ষ থেকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে । অবশ্য এ সবের অনেক কারণও আছে। সেগুলো হচ্ছে: রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতা, জনগণের দাবী বুঝতে ব্যর্থ হওয়া, এমনকি তার নিজের উপদেষ্টাদের কিছু পরামর্শের প্রতি কান না দেওয়া, মুসলিম ব্রাদারহুডের উর্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে অতিরিক্ত সম্পর্ক বজায় রাখা, ত্বরিত গৃহিত এবং অবিবেচনাপ্রসূত কিছু সিদ্ধান্ত (যেগুলোকে তিনি পরবর্তীতে ভুল বলে স্বীকার করেছেন)।
এ বিষয় গুলো অকুন্ঠচিত্তে সমালোচনাযোগ্য । আরো মৌলিকভাবে বলতে গেলে, মুরসীর সবচেয়ে বড় ভুল হচ্ছে–তাদের রাজনীতিক দর্শনের অনুপস্থিতি, রাজনৈতিক ও আর্থনীতিক অগ্রাধিকার নির্ণয়ের অভাব, দূর্নীতি ও দারিদ্রের বিরুদ্ধে লড়াই-এ পরাজয় এবং সামাজিক ও শিক্ষা বিষয়ে চরম অব্যবস্থাপনা । অর্থ ছাড়ে আইএমএফ এর স্বেচ্ছাকৃত দীর্ঘসূত্রীতা ও অতিরিক্ত শর্তারোপ মিশরকে একটি কঠিন পরিস্থিতিতে দাঁড় করিয়েছে । মুরসী ভেবেছিল- আইএমএফ তাদের অর্থ সাহায্য দেবে। মুরসীর পতনের পরই কেবল আইএমএফ অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে এতদিনের অলঙ্ঘ্যনীয় বাধাসমূহ দূর করতে সক্ষম হয় । গনতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের সামরিক শাসকদের অস্ত্রের মুখে পদচ্যুতির পরই কেবল এই ঘোষণা আসলো ।
প্রেসিডেন্ট মুরসী, তার সরকার এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের অর্বাচীনতা বিস্ময়কর । দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে মোবারক সরকারের বিরোধীতার সম্মুখীন এবং সামরিক স্বৈরশাসনের নির্যাতনের স্বীকার হয়েও কিভাবে তারা কল্পনা করল যে, তাদের পূর্ব শত্রুরা গনতন্ত্রকে আবাহন জানিয়ে মুরসীকে ক্ষমতাসীন করবে ? তারা কি তাদের পূর্ব ইতিহাস, ১৯৯২ সালের আলজেরিয়ার ঘটনা এবং এমনকি অতি সম্প্রতি ফিলিস্তীনের ইতিহাস থেকে কিছুই শিক্ষা নেয়নি । আমি মুরসী ও মুসলিম ব্রাদারহুডের পরিকল্পনা এবং দ্ব্যর্থবোধক কলা-কৌশলের ক্ষেত্রে তাদের আনাড়িপনা ও অনভিজ্ঞতার সমালোচনা করে আসছিলাম এবং এখনো করছি। (সশস্ত্র বাহিনীর সাথে আপোষ, যুক্তরাস্ট্রের সাথে যোগাযোগ, অর্থনীতি ও ফিলিস্তীন ইস্যুতে আত্মসমর্পন) এত কিছুর মাঝেও তাদের ‘রাজনৈতিক সচেতনতার অভাব’ স্তম্ভিতকর ।
সালাফি পার্টির, বিশেষত আল নূর পার্টি, সাথে সেনাবাহিনীর হাত মিশানো দেখে অনেক পর্যবেক্ষকই হতচকিত হয়েছে। “গণতন্ত্রপন্থী” সালাফীদের মুরসী বিরোধীতা এক ধরনের প্রহসন। চরমপন্থী সালাফীদের মুসলিম ব্রাদারহুডের মিত্র হিসাবে পরিচিত করার জন্য পশ্চিমা মিডিয়া ছিল ব্যাকুল । অথচ এরা প্রকৃত পক্ষে উপসাগরীয় দেশসমূহের শেখদের মিত্র । উপসাগরীয় এসব দেশ মধ্যপ্রাচ্যে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র । আর এটা করা হয়েছিল, মূলত মুসলিম ব্রাদারহুডের ‘ধমীয় বিশ্বস্ততা’ নষ্ট করার জন্য এবং মুসলিম ব্রাদারহুডকে (ধর্মীয়) চরমপন্থা অবলম্বনে বাধ্য করার জন্য । মুরসীর পতন ঘটানোর সময় তারা শুধুমাত্র ‘বিশ্বাসঘাতকতাই’ করলনা বরং বিশ্ববাসীর সামনে তাদের কূটকৌশল ও কৌশলগত মিত্রদের হাজিরও করল । এটা কোন বিস্ময়কর ব্যাপার নয় যে, মিশরের এই সামরিক অভ্যূত্থানকে প্রথম স্বাগত জানিয়েছে আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কাতার – যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সব সময় সালাফীদের সাহায্য করত এবং এখনও করে। বাহ্যত কারো কাছে মনে হতে পারে যে, সৌদি ও কাতার মুসলিম ব্রাদারহুডকে সমর্থন করে । কিন্তু বাস্তবে এইসব দেশ এই অঞ্চলে আমেরিকার প্রধান কৌশলগত মিত্র । এ অঞ্চলে আমেরিকার প্রধান কৌশল হচ্ছে বিভিন্ন ইসলামপন্থী ধারাগুরোর মাঝে বিভাজন তৈরী, পারস্পরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি ও তাদের অস্থিতিশীল রাখা । ঠিক একই কৌশল বজায় রাখা হয় সুন্নীভূক্ত বিভিন্ন রাজনীতিবাদী ইসলামপন্থী দলসমূহ এবং সুন্নী ও শিয়া সম্প্রদায়ের মাঝে বিভাজন অতিমাত্রিক করার জন্য । রাজনীতিবাদী ‘আক্ষরিক ইসলামপন্থী’ উপসাগরীয় সালাফী, তাদের গনতন্ত্র অস্বীকৃতি, সংখ্যালঘুদের অসম্মান, নারীর প্রতি বৈষম্য এবং ‘শরীয়া’ হিসাবে পরিচিত কঠোর ‘ইসলামি’ নীতিমালা প্রয়োগ ইত্যাদির সাথে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইউরোপের কোন দ্বন্দ নেই। কারন তারা (সালাফীরা) পশ্চিমাদের আঞ্চলিক ও আর্থনীতিক স্বার্থ রক্ষা করে। এসব উপ-সাগরীয় দেশসমূহের নির্যাতন ও পশ্চাৎপদ জাতীয় মুলনীতি যতদিন শুধু নিজ দেশের সীমার মধ্যে বিদ্যমান থাকবে এবং পশ্চিমাদের সাম্রাজ্যবাদ ও শোষনের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে না, ততদিন এই সব নিয়ে পশ্চিমাদের কোন মাথা ব্যথাও থাকবেনা ।
লক্ষ লক্ষ লোক এই তথাকথিত Second Revolution এর জন্য মুরসী বিরোধী বিক্ষোভ করে এবং সেনাবাহিনীর কাছে আবেদন জানায় । আর সেনাবাহিনী এতে দ্রুত সাড়া দেয়। সেনাবাহিনী এখন জনগনের হাতে ক্ষমতা প্রত্যাবর্তন করার প্রতিজ্ঞা করছে । বিরোধী দলের নেতা-আল বারাদেই এতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে এবং তার প্রাধান্য দ্রুতগতিতে বেড়ে চলে । ২০০৮ সাল হতেই তিনি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখছেন ‘সাইবার দুনিয়ার ভিন্ন মতাবলম্বী’ ও ‘৬ এপ্রিল আন্দোলনের’ সাথে । পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলার প্রমান আমি আমার বইয়ে উল্লেখ করেছি । তিনি নানা চাতুর্যপূর্ণ কৌশলের মাধ্যমে তার দৃশ্যায়ন বৃদ্ধি করেছেন যদিও তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ছিলেন (এবং ঘোষণা করেছিলেন যে তিনি প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হবেন না )।
তিনি মিশরের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ন ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তিনি কুখ্যাতভাবে মুসলিম ব্রাদারহুডের বন্দী প্রতিহত করেছেন, তার সাথে ঘনিষ্ঠ টিভিস্টেশনগুলো রক্ষা করেছেন এবং মুসলিম ব্রাদ্রারহুডের উপর যে নির্যাতন তাও এড়িয়ে গেছেন। সামনের দিনগুলোতে এই সামরিক শাসিত রাষ্ট্রটির ‘সুশীল চরিত্র’ আরো বিস্তারিতভাবে জানা যাবে। স্মরনীয়, গত কয়েক দশক ব্যাপী সামরিক বাহিনী দেশটির প্রায় ৪০% অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে এবং আমেরিকা থেকে প্রাপ্ত অর্থ সহায়তার (১.৫ বিলিয়ন ডলার) বড় অংশ ভোগ করে ।
সামরিক অভ্যূত্থানের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকারকে অপসারণ করা হয়েছে। এই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করার জন্য ‘অভ্যূত্থান’ ভিন্ন অন্য কোন শব্দ নেই । জনগণের টিকে থাকার জন্য উন্নততর জীবন ব্যবস্থা, ন্যায়বিচার ও স্বীয় মর্যাদাবোধের অধিকার দাবী নি:সন্দেহে যৌক্তিক। আর এই জন্য তারা নিজেদের অজ্ঞাতসারেই সবোর্চ্চ পর্যায়ের মিডিয়া ক্যু ও সামরিক ক্যু এর অংশীদার হয়েছে। পরিস্থিতি ভয়াবহ । পশ্চিমা সরকারগুলোর নিরবতা আমাদের অনেক কিছু জানান দিচ্ছে। আসলে “আরব বসন্তের” কিছুই এখানে নেই বরং বিপ্লবের গন্ধই টিয়ার গ্যাসের ন্যায় আমাদের চুক্ষর দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিচ্ছে।
বর্তমান সময়ে একজন লেখক প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতে প্রচলিত অনেক সত্যকে বিশ্বাস করেনা তাকে “ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিক” আখ্যা দিয়ে সহজেই প্রত্যাখান করা হয়। সে ক্ষেত্রে তার বিশ্লেষণের ভিত্তিকে মূল্যায়ন করা হয়না। আমাদেরকে কী তাহলে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, বর্তমান গ্লোবাল বিশ্বে রাষ্ট্রের জাতীয় নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, নতুন ধারার যোগাযোগ প্রযুক্তি, রাজনৈতিক পরিকল্পনা, বিদ্বেষপরায়ন কৌশল, তথ্য বিকৃতি, মানব শোষনের বিষয়গুলো সব অতীতের কোন ঘটনা ? কিছু ভ্রমগ্রস্ত লোক আছে যারা যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইজরাইল, আরব ও আফ্রিকার স্বৈরতান্ত্রিক দেশের ঐন্ত্রজালিক ক্ষমতায় বিশ্বাস করে যা প্রকৃতপক্ষে তাদের নেই। “ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিক’’ আখ্যাটি আধুনিক কালের একটি অপমান কৌশল যা উদ্ভাবন করা হয়েছে তাদের জন্য যারা এসব কে অস্বীকার করে । ষড়যন্ত্র বলতে আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় যা দেখেছি আমাদের আজ তা অবশ্যই ভুলে যেতে হবে ( সালভাদর এ্যালেন্দীর গুপ্ত হত্যা এবং থমাস সানকারার এলিমিনেইশন হতে) ।
আমাদের অবশ্যই উপেক্ষা করতে হবে সেই মিথ্যাচার যা ইরাকে আক্রমন ও গাজায় গণহত্যার জন্য দায়ী ছিল। শেখদের রাজ্যসমূহের চরমপন্থী সালাফীদের সাথে পশ্চিমাদের যে আঁতাত সে সম্পর্কে কিছুই বলা যাবে না । ইজরাইলের স্বার্থে আঞ্চলিক অস্থিরতা ও সর্বশেষ ঘটে যাওয়া মিশরের সামরিক অভ্যূত্থানের ব্যাপারে আমাদের চোখ অবশ্যই বন্ধ রাখতে হবে। আমাদের থাকতে হবে ‘কচি খোকা’ ও ‘সরল বিশ্বাসী’ হয়ে যদি আমরা এটা লক্ষ্য করতে না পারি যে, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন’ এবং ‘রাশিয়া ও চাইনা’ এই দু’ পক্ষ সর্বসম্মতভাবে সিরিয়ার বিষয়ে তাদের “অনেক্যের ব্যাপারে ঐকমত্য” হয়েছে যার ফলে প্রতিদিন কেবলমাত্র বৃহত্তর শক্তিসমূহের কৌশলগত ও আর্থনীতিক স্বার্থের জন্য ১৭০ জন সিরিয়ান মুসলিম নাগরিক জীবন বলি দিচ্ছে।
আমাদের আবশ্যিক দায়িত্ব হচ্ছে সব বিষয়ে অতি সরলীকরণ বাদ দিয়ে প্রকৃত তথ্যের অনুসন্ধান করা। ঘটনার অতি সহলীকরন পাঠের মাধ্যমে বিপরীত মেরুকরনকে ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ বলা হয়না বরঙ বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে, ঐতিহাসিক তথ্য ও প্রকৃত ঘটনাবলী এবং দ্বান্দ্বিক স্বার্থের সঠিক বিশ্লেষনকেই বলা হয় ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ ।
এখানে যে ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হয়েছে তা ভুল বা অযথার্থ হতে পারে। কিন্ত পর্যাপ্ত তথ্য ও প্রতিপাদনযোগ্য প্রমান এগুলো নিশ্চিত করছে। যারা আমাদের এ বিশ্লেষনকে সমালোচনা কিংবা চ্যালেঞ্চ করবে আমরা পরবর্তীতে এদের জন্য শুধুমাত্র বিরোধীতা ও অতি সরলীকৃত স্লোগান হতে দূরে থেকে তথ্য ভিত্তিক কাউন্টার এ্যানালাইসিস উপস্থাপন করব । যখন জনগণ একটি সামরিক অভ্যুত্থানকে তার প্রকৃত নামে ডাকতে অস্বীকার করে, যখন সকল মিডিয়া তাদের চোখ ফিরিয়ে রাখে- তখন সচেতন বিবেক হয় বাকরুদ্ধ।